পহেলা বৈশাখ উদযাপন বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের প্রধানতম সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। এই উদযাপনের সবচেয়ে প্রভাবাশালী প্রকাশ ঘটে বৈশাখী মেলার মধ্য দিয়ে। বাড়িতে বাড়িতে চৈত্রের শেষ দিন ‘তিতা’ এবং পহেলা বৈশাখে ‘ভালো-মন্দ’ খাবারের আয়োজন, গ্রামীণ দোকানপাটে হালখাতার আয়োজনসহ বিভিন্ন আচার পালিত হলেও বৈশাখী মেলাই সমাজের আনাচকানাচে সর্বজনীন উত্তেজনা ছড়িয়ে দেয়।
বিশ্বমাঝে আমাদের জাতিগত পরিচয়চিহ্ন হিসেবে পহেলা বৈশাখই সর্বাগ্রে বিবেচিত হয়।
বিশেষ করে ২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর ইথিওপিয়ার আদ্দিস আবাবায় অনুষ্ঠিত ইউনেসকোর পরিবর্তনশীল সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ বিষয়ক আন্তঃরাষ্ট্রীয় কমিটির ১১তম অধিবেশনে পহেলা বৈশাখের ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা‘ রিপ্রেজেনটেটিভ লিস্ট অব ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ অব হিউম্যানিটি’র অন্তর্ভুক্ত হয়ে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ বিশ্বঐতিহ্যের স্বীকৃতি লাভ করে। এই বর্ণিল শোভাযাত্রাটি প্রকৃতপক্ষে স্বাধীন বাংলাদেশে সৃষ্ট নতুন ঐতিহ্য, বিশেষ করে নগরীয় পরিসরে। এ রকম ঘটে। বিংশ শতকের সবচেয়ে প্রভাবশালী ফোকলোরতাত্ত্বিক অ্যালেন ডান্ডেস দেখান যে, নির্দিষ্ট জনপদের সংস্কৃতি স্থির থাকে না—পরিবর্তিত হয়, সংস্কৃতির কিছু উপাদান সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিলুপ্ত হতে পারে, রূপান্তরিত তো হয়ই, আবার মানুষ সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে সৃষ্টি করে নব ঐতিহ্য, যা পরবর্তীকালে পরম্পরায় প্রবহমান থাকে।
তার মানে, ‘হাজার বছরের’ ধারাবাহিক চর্চাই শুধু ঐতিহ্য নয়, বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রার মতো নব ঐতিহ্যের উদাহরণ পৃথিবীতে যথেষ্ট রয়েছে। তবে শোভাযাত্রা নিয়ে আমাদের আলোচনা নয়, নগরীয় বৈশাখী উৎসব নিয়েও নয়; বরং সামগ্রিক পহেলা বৈশাখ নিয়ে।

এটাও ঠিক যে, গ্রামবাংলাও নগরায়ণের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। এটা ঘটাই স্বাভাবিক, কেননা আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থায় কোনো কিছুই পরিকল্পিত নয়—সব ধরনের পরিকল্পনাকে ‘আল্লাহর ওয়াস্তে’ ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
এবং সংস্কৃতি এই রাষ্ট্রে সবচেয়ে উপেক্ষিত খাত। একদিকে আপন জীবনাচার নিয়ে আমাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক অরুচি আছে; অন্যদিকে জোর করে পশ্চিমা ও মধ্যপ্রাচ্যীয় ককটেল সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার আত্মঘাতী প্রাতিষ্ঠানিক প্রবণতা স্পষ্ট। কিন্তু সংস্কৃতির শক্তি এত বেশি যে, সে নিজের রাস্তা তৈরি করে নিতে সক্ষম সকল প্রেক্ষাপটে। এর কারণ, সামাজিক জীব হিসেবে মানুষ সংস্কৃতিমণ্ডিত—সব দেশে, সব কালে।
সাম্প্রতিক বাংলাদেশে গ্রামীণ মানুষের স্থানান্তর এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা; অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক উভয় ধরনের স্থানান্তরই।
তা সত্ত্বেও বেশির ভাগ মানুষ জন্মগ্রামের সঙ্গে কঠোর সূত্রে বাঁধা—চিন্তা, চেতনা ও মননে। গ্রামের বাড়িকে তাই বাংলা ভাষায় আজও ‘দেশের বাড়ি’ বলা হয়; এবং এই পরিভাষাও প্রকৃতপক্ষে হৃদয়ের গভীরে প্রোথিত সাংস্কৃতিক মানস থেকেই জাত। আর কোনো বাড়ি বাংলার মানুষের নেই, যা আছে তার নাম বাসা—ফ্ল্যাট, অ্যাপার্টমেন্ট, বস্তিঘর। তবে অ্যালেন ডান্ডেসের কালজয়ী পর্যবেক্ষণ হলো, মানুষ বাস্তব প্রয়োজনে যে পরিসরেই চলাচল করুক, সে তার মননে আদ্য সংস্কৃতি বহন করে চলে। যেহেতু সে নতুন নতুন পথে চলে, তাই তার সংস্কৃতি সব সময় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এগোয়।
কেন বদলায় সংস্কৃতি? বদলায় উৎপাদনব্যবস্থার বিবর্তন, যোগাযোগ-প্রযুক্তির অভাবনীয় বিস্তার, তথাকথিত বিশ্বায়ন, অর্থনৈতিক পরিবর্তন, সামাজিক বিন্যাসে দৃশ্যমান ভাঙন, মানুষের স্বেচ্ছা কিংবা বাধ্যতামূলক স্থানান্তর, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বাজারব্যবস্থা, ভৌগোলিক বিভাজন বা একীভবন, রাজনৈতিক পালাবদল, জলবায়ু পরিবর্তন, যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ইত্যাদির বিবিধ অভিঘাতের প্রতিক্রিয়ায়। তার পরও বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে প্রভাবশালী ফোকলোরতাত্ত্বিক অ্যালেন ডান্ডেস বলেন, সব পরিস্থিতিতেই সব জীবনধারায় এমন সব স্বতন্ত্র প্যাটার্ন থাকে, অভিব্যক্তি দেখা যায়, যা দিয়ে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি নির্দিষ্ট করা সম্ভব হয়; এবং সংস্কৃতি দ্বারাই নির্দিষ্ট জনপদ, জনগোষ্ঠী বা জাতির পরিচয় নির্ধারিত হয়।

এ ক্ষেত্রে মহামতি আহমদ শরীফ প্রশ্ন তুলেছিলেন, বাঙালির সংস্কৃতি কী? কী চিহ্ন দ্বারা তার পরিচয় নির্দিষ্ট হয়? তিনিও পুনর্নিশ্চিত করেছিলেন যে, সংস্কৃতিই জাতির পরিচয় নির্ণায়ক। তারপর বলেছিলেন, বাঙালির সংস্কৃতি ‘অনির্দিষ্ট’। এই জাতির ভাষা বহুমাত্রিক—অসংখ্য রূপভেদের সমন্বয়। এখানে পোশাকের নির্দিষ্টতা নেই, আচরণেরও নেই। এখানে সংস্কৃতিকে মনে করা হয় ধর্মের শত্রু, ধর্মকেও সংস্কৃতি হিসেবে প্রচার করা হয়। কিন্তু সূক্ষ্মভাবে তাকালে এই ভূখণ্ডের মানুষের জীবনধারায় এমন কিছু দৃশ্য, মনোভাব, উত্তেজনা, চিন্তা, আচরণ, কার্যক্রম লক্ষ করা যায়, যা স্বতন্ত্রই। এই স্বাতন্ত্র্যের জীবন্ত ও বৃহত্তম প্রকাশ ঘটে পহেলা বৈশাখে। আমাদের সামষ্টিক পরিচয় স্বাতন্ত্র্য প্রকাশে পহেলা বৈশাখ তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎসব। পহেলা বৈশাখ উদযাপন বাংলাদেশের আপামর জনজীবন ধারার অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ।
সংস্কৃতি অবশ্য ততটুকুই বদলায়, যতটুকু জীবনমানের বদলের সঙ্গে অনিবার্য। তবে তা কোনোমতেই পরম্পরাবিচ্ছিন্ন হতে পারে না। যদি তেমন ঘটনা ঘটে (ঘটে তো বটেই), তাহলে সংস্কৃতি থেকে সে উপাদান বিলুপ্ত হয়েছে বলে ঘোষণা করা চলে। কিন্তু পহেলা বৈশাখ কালের পরিক্রমা উজিয়ে ঐতিহ্য হিসেবে টিকে আছে—বাংলাদেশের সর্বত্র। এমন এক ঐতিহ্য, যার দ্বারা বৈশ্বিক পরিসরে বাঙালি ও বাংলাদেশে বসবাসরত সব নৃতাত্ত্বিক জাতিগোষ্ঠীকে একসূত্রে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়। কেননা এ দেশে পহেলা বৈশাখ দ্বারা প্রভাবিত নয় এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া শুধু মুশকিলই নয়, প্রায় অসম্ভব। এমনকি যিনি অপরিমেয় এই সাংস্কৃতিক উপাদানকে বিশেষ ধর্মের অনুষঙ্গ সাব্যস্ত করে ফতোয়া জারি করতে চান, তিনিও পহেলা বৈশাখ পালনের বিপুল প্রভাব থেকে মুক্ত নন।
নির্দিষ্ট অঞ্চলের সংস্কৃতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রকৃতির সম্পর্ক নিবিড়। আমরা লক্ষ করি, বৈশাখের আগমনী বার্তা প্রকৃতিও নিজস্ব ভাষা ও ছন্দে ছড়িয়ে দেয়, জনজীবনে তা প্রকাশিত হয় বহুমাত্রিক প্রস্তুতি, উৎসাহ ও অন্তর্লীন উত্তেজনার ভেতর দিয়ে। চৈত্রের খরদাহে ঝিঁঝি পোকা গাছের ডাল-পাতায় উঠে তীব্র অথচ ছন্দিত লয়ে ডাকতে থাকে। যদিও প্রাণিবৈজ্ঞানিক দিক থেকে দেখলে ঝিঁঝি পোকা তার ছোট্ট পাখা অতি দ্রুত কাঁপিয়ে এই শব্দ তৈরি করে বিপরীত লিঙ্গের ঝিঁঝিকে আকর্ষণ করতে, কিন্তু গ্রামীণ মানুষের বিশ্বাস, বৈশাখী মেলার আগমনী সংগীতই যেন সে পরিবেশন করে চলে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, পহেলা বৈশাখে এই ডাক মিলিয়ে যায়—শুরু হয় মানুষের অন্তর্গত সংগীতময়তা নিয়ে বৈশাখী মেলা, চলে পুরো মাস। প্রকৃতপক্ষে মেলা চৈত্রেই শুরু হয় গ্রামীণ জনপদে। এই ১৪৩২ বঙ্গাব্দের শেষ প্রান্তে এসে চৈত্রের মাঝামাঝি বগুড়া জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার সর্বপূর্বে অবস্থিত কুকিকালিদাশ-সাতনাপাড়া-জীবনপুর গ্রামসমূহে এই বাস্তবতা প্রত্যক্ষ করার সুযোগ হয়। ধারণা করি, নগরীয় হট্টগোল থেকে দূরে, সব গ্রামেই সমিল চিত্র রয়েছে।
যদিও গ্রাম যেন হয়ে উঠেছে পরিবর্তনের এক জীবন্ত ডকুমেন্টারি—কাঁচা ঘর নেই বললেই চলে, প্রাচীন বৃক্ষরাজি উধাও, রাস্তাঘাট পাকা, স্যাটেলাইট টেলিভিশন অনেক ঘরেই ঢুকেছে, প্রায় সব কিশোর-কিশোরী-তরুণের চোখ হাতের মুঠোফোন স্ক্রিনে—সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সত্যের মতো দেখতে মিথ্যা বুলি ও দৃশ্য ঘিরে পাক খাচ্ছে নতুন প্রজন্ম, মোড়ে মোড়ে দোকান—তাতে চিপস, স্পিরিটসহ বহুবিধ নগরীয় উপাদান। তরুণরা কেউ বিদেশের শ্রমবাজারে, কেউ ঢাকামুখী, কেউ বা স্থানীয়ভাবে জীবিকার নতুন ক্ষেত্রে যুক্ত—মোটর লাগানো রিকশা-ভ্যান চালানো, মোটরসাইকেল, বিদ্যুৎ, আরো কত কী, যা অল্পদিন আগেও কল্পনা করা যেত না। ঐতিহ্যগত টং-আড্ডার জায়গা দখল করেছে অর্থকেন্দ্রিক নতুন সামাজিকতা। তবে যা সবচেয়ে বেশি দরকার ছিল—সঠিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা, কিংবা জ্ঞানচর্চার বন্দোবস্ত—তা অনুপস্থিত। তবু এই দৃশ্যমান পরিবর্তনের ভেতরেও বিমূর্ত, পরম্পরাগত এক সাংস্কৃতিক সুতা সক্রিয় রয়ে গেছে, যাকে তাত্ত্বিক পরিভাষায় ‘ফোকলোরের সামাজিক প্রক্রিয়া’ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়, যেখানে লোকায়ত অভ্যাস, বিশ্বাস ও চর্চা সময়ের স্রোত উজিয়েও টিকে আছে। বৈশাখ আসার আগেই সাতনাপাড়ায় বসেছে হরিবাসর। তাতে আশপাশের তো বটেই, যোগ দিয়েছে দূর গ্রামের মানুষও। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত কীর্তনিয়াদের পরিবেশনা দেখতে দূরদূরান্ত থেকে হাজির হয়েছে সুসজ্জিত নারী-পুরুষ, হিন্দু-মুসলমান—সবাই। আত্মীয়তা করা, সারা রাত জেগে থাকা, একসঙ্গে সেবা (খাবার) গ্রহণ করা, আসন্ন বৈশাখী মেলায় কী হবে, কে কী করবে তা নিয়ে ভাববিনিময়—সব মিলে দেখতে পাওয়া গেল এক ধরনের ‘কমিউনাল পারফরম্যান্স’, যাকে টিমথি রাইসের সংগীত নৃবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে সামষ্টিক স্মৃতিতর্পণ, আত্মপরিচয় অনুসন্ধান, পরিচয় পুনর্নির্মাণ, প্রদর্শন ও সঞ্চার হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়। ঐতিহ্যবাহী সংগীত আয়োজন, পৌরাণিক কাহিনির সমসাময়িক উপস্থাপন দেখা, শোনা এবং তা নিয়ে পারস্পরিক প্রতিক্রিয়া প্রকাশের ভেতর দিয়ে সমবেত মানুষ নিজেদের নতুন করে খুঁজে পাচ্ছে, ঐতিহ্যকে স্বতঃস্ফূর্ত প্রক্রিয়ায় প্রতিপালন করে চলেছে। নারী, পুরুষ, শিশু, তরুণ, কিশোর-কিশোরী, বয়স্ক ব্যক্তি—সবাই এই ধারার সঙ্গে আত্মিকভাবে সংযুক্ত। এখানে ধর্মীয় পরিচয় কোনো বিভাজন তৈরি করেনি; বরং সনাতন ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতায় একটি সামষ্টিক পরিসর নির্মিত হয়েছে। সেখানে শুধু সামষ্টিক স্মৃতিতর্পণই নয়, নিকট-ভবিষ্যৎ পর্যালোচনাও গুরুত্বপূর্ণ—চৈত্রসংক্রান্তিতে কী করা হবে, অতীতে কী হতো, এবারের বৈশাখী মেলায় আগের মতো সব আয়োজন করা সম্ভব হবে কি না…।
বৈশাখী উৎসব, বিশেষ করে বৈশাখী মেলার সময়গত পরিসরের প্রারম্ভ সুতরাং চৈত্র থেকেই। শুধু মেলাটুকুই নয়, মেলা ঘিরে তৈরি হওয়া সামাজিক অনুভব, বিশেষ বিশেষ পণ্য বিপণনের উদ্দেশ্যে প্রস্তুত করা এবং প্রয়োজনীয় পণ্য সংগ্রহের পরিকল্পনা, ঐতিহ্যবাহী নানা পরিবেশনা আয়োজনের প্রস্তুতির ভেতর দিয়ে দানা বাঁধতে থাকে বৈশাখী মেলার আমেজ। পুরো প্রক্রিয়াটি এতটাই যৌথ যে শিশু থেকে বৃদ্ধতর সবাই জড়িয়ে পড়েন বৈশাখের সঙ্গে আবেগগতভাবে।
বাংলার গ্রামজীবনের হৃত্স্পন্দন যেন স্পষ্টতর হয়ে ওঠে বৈশাখী মেলাকে কেন্দ্র করে। এই প্রাণময় উৎসবের পেছনে থাকে দীর্ঘ প্রস্তুতির গল্প—গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী কারিগরদের নিরলস পরিশ্রম, স্বপ্ন আর বেঁচে থাকার এবং ঐতিহ্য ধরে রাখার সংগ্রাম। বৈশাখ আসার বহু আগেই গ্রামের মাটি, বাঁশ, কাঠ, লোহা, কাপড় আর রঙের ঘ্রাণে ভরে ওঠে কারিগরদের আঙিনা।
কেউ গড়ে তোলে মাটির পাত্রে দেশজ মোটিফসমৃদ্ধ নকশা, তৈরি হতে থাকে নানা রকম মিষ্টি। কেউ বা বড় বড় মাছ ধরার আয়োজন করে—মেলায় বেচবে বলে। ঘুড়ি প্রস্তুতকারকরা রঙিন কাগজে বিচিত্র ডিজাইনের ঘুড়িতে আকাশ ভরানোর স্বপ্ন রচনা করে। ঘুড়িকে উত্তরবঙ্গে বলা হয় ঘুড্ডি। চং ঘুড্ডি, ঘর ঘুড্ডি, চিল ঘুড্ডি, সাপ ঘুড্ডি, বেনা ঘুড্ডি—কত কী! আকাশে উড়ন্ত ঘুড্ডির বেনায় লাগানো ছড় বাতাসে বোঁ বোঁ করে বাজতে থাকে। অরিগ্যামি শিল্পীরা কাগজে প্রাণসঞ্চার করে আকর্ষণীয় শখের পণ্য বানায়। এসব দেশি দ্রব্যকে শুধু পণ্য বললে ভুল হবে, এগুলো তো বাংলার ঐতিহ্যগত শিল্পীমনের অনন্য অভিব্যক্তি।
হাজারো শিশু-নারী-পুরুষের বছরকার আনন্দ পরিপূর্ণ করতে বৈশাখী মেলায় থাকবে সার্কাসের বিরাট তাঁবু, যাত্রাপালার আলো-ঝলমল প্যান্ডেল, ছায়াবাজি, পুতুলখেলা, মৃত্যুকূপে মোটরসাইকেল আর গাড়ির দুঃসাহসী গতির প্রদর্শনী, জাদুকরের ভেলকিবাজি, হাউজি, লটারি। সব মিলিয়ে রচিত হবে এক বিস্ময়ের জগৎ। এই আয়োজনগুলোর পেছনেও রয়েছে শত শত মানুষের কঠোর অনুশীলন ও প্রস্তুতি, স্বপ্ন, ঐতিহ্যপ্রেম এবং চিরায়ত সৌন্দর্যবোধ। সার্কাসদলের শিল্পী, যাত্রাপালার অভিনেতা, পুতুলনাচের কারিগর, মৃত্যুকূপের বাইকার, নাগরদোলার চালক, জাদুশিল্পী, নৃত্যশিল্পী, বাউল, বয়াতি—সবাই বৈশাখ ঘিরে মাসের পর মাস প্রস্তুতি নিতে থাকে। এই একটিমাত্র মেলাকে কেন্দ্র করেই তাদের প্রায় সারা বছরের জীবিকা নির্ভর করে।
খেলনার দোকানগুলো হয়ে উঠবে শিশুদের স্বপ্নপুরী। বাঁশের বাঁশি, বেলুন লাগানো বেতের তৈরি বাঁশি, কাঠের খেলনা, টমটম গাড়ি, মাটির পুতুল, টিনের পিস্তল, প্লাস্টিকের তলোয়ার—সবই গ্রামীণ কারিগরের হাতে সাংস্কৃতিক পণ্যে রূপ লাভ করে। আবার আলপনা আঁকার কাঠের ছাঁচ, বিচিত্র প্রাণীর আদলের মুখোশ, পরচুলা—সবকিছুতেই লুকিয়ে থাকে লোকজ ঐতিহ্যের ছোঁয়া। শিশু-কিশোরীরা ভিড় করবে চুড়ি-ফিতা-আলতাসহ অলংকার ও প্রসাধনীর দোকানগুলোতে।
জীবনযাপনের দরকারি সামগ্রীও বাদ যাবে না মেলা থেকে। ধনে, রসুন, মেথি, হলুদ, কালিজিরা, তিল, তিসি, সরিষা, তেজপাতা, শিমুল তুলা—কত কী! স্থানীয় কারিগররা সাজিয়ে বসবে বঁটি, দা, ছুরি, কাঁচি, কোদাল, খুন্তি, শিল-পাটা, জাঁতি—যা কৃষকের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গী আজকের প্রযুক্তিচালিত কৃষিযুগেও। কাঠমিস্ত্রিরা সাজিয়ে বসবে খাট, বসার আসন, দরজা-জানালা, চেয়ার-টেবিল, জলচৌকি, পিঁড়ি, লাঙল, জোয়াল, মই। পাওয়া যাবে দড়ি, সুতা, সুচ, উলের কাঁটা, মাছ ধরার জালসহ ডারকি, বানা, বরশির মতো জীবনধারণের বিচিত্র উপকরণ।
তাই বলে বৈশাখী মেলা শুধু কেনাবেচার আয়োজন নয়, শুধু বিনোদনও নয়; এটি সামাজিক ও আত্মীয়তার সম্পর্ক নবায়ন করারও আয়োজন। সম্প্রীতি দৃঢ় করার কার্যকর সমাবেশ। মেলায় থাকে রকমারি বাহারি খাবারের পসরা, ফলের জুস, আখের রস, মিষ্টি খিলিপান, যা উৎসবকে করে তোলে উপভোগ্য। জামাইদের দাওয়াত দিতে হবে, মেয়েরা বাপের বাড়ি আসবে, মেলাস্থানের আশপাশের গ্রামগুলো ভরে যাবে দূরের আত্মীয়-স্বজনে; বড় মাছ, পান-চুন-সুপারি ও মিষ্টি উপহার দেওয়া চলবে পরস্পরকে—একে শুধু ব্যবসা, আনন্দ ও সম্মিলন হিসেবে দেখা চলে না; বৈশাখী উৎসব আমাদের সাংস্কৃতিক জীবনের সবচেয়ে সমন্বিত অভিব্যক্তি, যা শুধু মেলার অঙ্গনে সীমাবদ্ধ নয়; পারিবারিক, সামষ্টিক, এমনকি ব্যক্তিজীবনের গভীর পর্যন্ত বিস্তৃত। একমাত্র এখানেই ঘটে সব ধর্ম, অর্থনৈতিক শ্রেণি, সব বয়স এবং সব লিঙ্গের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সম্মিলন। অসংখ্য মেলাযাত্রী থাকে, যারা কিছু বেচতে নয়, কিনতে নয়; নতুন পোশাক পরে মেলায় যায় নিখাদ উচ্ছ্বাস, উদ্দীপনা এবং আনন্দের বৈচিত্র্য উপভোগ করতে। সুতরাং বৈশাখী মেলা গ্রামীণ অর্থনীতি, সংস্কৃতি, উৎসব, আনন্দ, মানুষের মহামিলনসহ বাঙালি জীবনের এক অপূর্ব সমন্বয়। এখানেই টিকে থাকে শত বছরের ঐতিহ্য; আর বেঁচে থাকার নতুন আশায় বুক বাঁধে অসংখ্য মানুষ। বৈশাখী মেলা একাই ধারণ করে বাংলাদেশের বিচিত্র ট্যানজিবল ও ইনট্যানজিবল সাংস্কৃতিক উপাদান—সাংস্কৃতিক পণ্য, সংগীত, নৃত্য, পালা, বাউলগান, স্থানীয় পরিবেশনা শিল্প, ধর্মীয় সম্প্রীতি, অর্থনৈতিক শ্রেণির ঊর্ধ্বে অকৃত্রিম মিলন। এখানে মানুষ খুঁজে পায় বছরব্যাপী বেঁচে থাকার অমিয় অনুপ্রেরণা।
সমাজের প্রত্যেক স্বতন্ত্র সত্তা যে উপাদান থেকে নিজেকে আলাদা করে রাখতে পারে না, সেই উপাদানই সর্বজনীন সংস্কৃতিগত উপাদান।
এ কারণেই বৈশাখের ঐতিহ্য, যা চৈত্র থেকেই উত্তাপ ছড়ায়, যোগ্যতা রাখে আমাদের সংস্কৃতির প্রাণ হিসেবে অভিহিত হওয়ার। সংগীত নৃবিজ্ঞানী ব্রুনো নেটল উল্লেখ করেছিলেন, পরম্পরায় প্রবাহিত সংগীত-ঐতিহ্য সমাজকাঠামোর সকল সুতার শক্তি পুনরুজ্জীবিত করার ক্ষমতা রাখে। তেমনি বৈশাখী মেলা এবং আগে-পরের অপরাপর আচার-উৎসবও বাংলাদেশের সকল বহুত্ব তথা ভিন্নতাকে সমন্বিত করে সম্প্রীতির বন্ধনে ঐক্যবদ্ধ করতে পারে।
সম্প্রীতির এই রূপ বিশ্লেষণ করলে আহমদ শরীফের বাঙালি সংস্কৃতির ধর্মনিরপেক্ষ ভিত্তি এবং শামসুজ্জামান খানের লোকসংস্কৃতির বহুত্ববাদী চরিত্রের ধারণা আমরা বেশ বুঝতে সক্ষম হই। আমাদের বলতেই হয়, গ্রামীণ বৈশাখী উৎসব শুধু একটি ঋতুচক্রভিত্তিক আয়োজন নয়; এটি একটি সাংস্কৃতিক অভিসৃতি, যেখানে ভিন্ন ধর্ম, ভিন্ন পেশা, ভিন্ন অর্থনৈতিক অবস্থানের মানুষ একত্রে নিজেদের সামষ্টিক পরিচয় প্রকাশ করে। প্রকৃতিও যেন এই সম্মিলনে যুক্ত হয়।
বাঙালি জীবনধারা নিঃসন্দেহে রূপান্তর লাভ করেছে। এই রূপান্তরের ভেতরেও কি মানুষ তার সাংস্কৃতিক পরম্পরা থেকে বিচ্ছিন্ন হতে পারে? বরং সকল আর্থ-সামাজিক-প্রাকৃতিক-প্রযুক্তিগত-উৎপাদনগত পরিবর্তনের সাপেক্ষে বৈশাখী মেলা ভূমিকা পালন করে বাংলাদেশের বৃহত্তর গ্রামীণ জীবনের সাংস্কৃতিক পুনর্গঠনের কেন্দ্র হিসেবে। মেলার সীমা মেলা প্রাঙ্গণে সীমাবদ্ধ থাকে না একেবারেই, বরং জনপদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে—মানুষের বুলিতে, স্মৃতিতে, স্বপ্ন ও প্রত্যাশায় মিশে থাকে বৈশাখী মেলার রং।
সমসাময়িকতার বহুমাত্রিক চাপ সত্ত্বেও বাঙালির সাংস্কৃতিক জীবন এখনো তার লোকায়ত ভিত্তির ওপরই দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত। পরিবর্তন এসেছে, আসবে; কিন্তু সেই পরিবর্তনের ভেতর দিয়েই পরম্পরাগত ঐতিহ্য নিজেকে নতুনভাবে রূপান্তর করে টিকে থাকবে। বৈশাখের মরতবা তাই শুধু মৌসুম ও কৃষিভিত্তিক জীবনব্যবস্থার অংশ হিসেবে দেখলে চলে না; বৈশাখী মেলা প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের অবিনাশী বিমূর্ত সাংস্কৃতিক ধারার মূর্ত প্রতিফলন।
পহেলা বৈশাখ উদযাপনের ধারাবাহিকতাকে নগরীয় চোখ দিয়ে দেখলে আমরা খণ্ডিত পহেলা বৈশাখই দেখতে পাব। প্রান্তিক গ্রমাঞ্চলে প্রবহমান সংস্কৃতির ঐতিহ্যগত বিপুল উপাদানসমষ্টি মিস করব।
আমরা ভুলে যাই যে, চৈত্রসংক্রান্তি ও পহেলা বৈশাখ মিলেই বাংলা বর্ষবরণ। এই পার্বণগুলো এমনকি আমাদের খাদ্য সংস্কৃতিকেও পুনর্নির্মাণ করে। এখান থেকে প্রজন্মান্তরে আমরা শিখি, কখন শুধুই শুকনো খাবার চলে, কখন তিতা খাবার, কখন রসালো খাবার। শুকনো খাবার বলতে শস্যদানা ভাজা, শাকপাতা ভাজা ও শুঁটকি ভর্তার সঙ্গে ভাত বা খুদের ভাত। কেউ কেউ নিমপাতা, চাল ভাজা, ডাল ভাজা, দুধ, যবের ছাতু, কলা নাশতা হিসেবে খায়। দুপুরে সাত রকম তরকারি দিয়ে ভাত খায়। শাকপাতা হতে হবে সাত রকমের। এর মধ্যে থাকবে খুরিয়াশাক, বতুয়াশাক, ঢেকিয়াশাক, কলমিশাক, আলোকলতার পাতা, চামঘাস, কচুশাক, পাটশাক, সজনেপাতা ইত্যাদি। এগুলোর মধ্যে যে এলাকায় যেটা বেশি পাওয়া যায়, সেগুলোর সাত রকম শাক একত্র করে শুকনো করে ভাজা হয়। সজনে ডাঁটা দিয়ে ডালের চচ্চড়ি সবচেয়ে জনপ্রিয়। আমিষ চলে না, বিশেষ করে চৈত্রসংক্রান্তিতে। কৃষিনির্ভর ঘরে এ রকম নানা পদের শাক দিয়ে ভাত বা খুদের ভাত খাওয়ার দৃশ্য সাধারণ। গ্রামীণ হিন্দু-মুসলমান সবার পাতেই শুঁটকি বা সিদল ভর্তা বছরের প্রথম দিন অত্যন্ত জনপ্রিয়। স্বীকার করি, এই নামগুলো উত্তরবঙ্গে যতটা পরিচিত, অন্যান্য অঞ্চলে কেমন তা আমার অজ্ঞাত। কেননা আমি উত্তরবঙ্গের মানুষ। উত্তরবঙ্গ সংস্কৃতিগতভাবে যেকোনো পরিস্থিতিতেই উৎসব-পার্বণ-ঐতিহ্যপ্রেমী। যা হোক, পহেলা বৈশাখে প্রত্যন্ত গ্রামীণ কৃষক পরিবারের পাতে ইলিশ মাছ দেখতে পাওয়া মোটেই সাধারণ ঘটনা নয়। বরং সকাল সকাল শস্যদানা ভাজা খাওয়ার চল আছে। সেও ওই সাত রকম শস্যদানা। চাল ভাজা, গম ভাজা, সরিষার দানা ভাজা, তিল ভাজা, তিসি ভাজা, কাউন ভাজা (চরাঞ্চলে চিনা ভাজা) এবং ডাল (বুট বা খেসারি/ঠাকরি কালাই বা মুগ) ভাজা রেওয়াজ অনুসারে পহেলা বৈশাখে একটু একটু করে চিবাতে হয়। জাতনিমের পাতা ভাজা খাওয়া পহেলা বৈশাখে বৃহত্তর রংপুর-দিনাজপুরের জনপ্রিয় রীতি। কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী এলাকায় এমন এক ধরনের কচু খড়ির চুলায় পুড়িয়ে খাওয়া হয়, যা খেলে অবশ্যই মুখ-গলা চুলকাবে। মনে করা হয়, এতে সারা বছর মুখের ঘা হবে না। এ ছাড়া পুদিনাপাতার বড়া, তুলসীর বড়া, গন্ধভাদুলের বড়া, বেতগাছের কচি ডগার বড়া এই দিনে প্রস্তুত হয়। কোনো কোনো এলাকায় আনারসের পাতা, কাঁচা হলুদ ও তুলসীপাতার শরবত খাওয়াও পহেলা বৈশাখের রীতির অন্তর্ভুক্ত।
গ্রামের বাড়িগুলোর চারদিকে এদিন বিষকাটালির ডাল ভেজানো পানি ছিটিয়ে দেওয়া হয়। মনে করা হয়, বছরের প্রথম দিন বাড়িঘরে বিষকাটালির ডাল ধোয়া পানি ছিটালে ঘরবাড়ি সারা বছর বিষাক্ত পোকামাকড়মুক্ত থাকবে। নববর্ষের উষালগ্নে অঞ্চলের গৃহীরা নিজ নিজ বাস্তু, জমি ইত্যাদিতে খড়-বর্জ্য জ্বালিয়ে দেন। এতে একদিকে আগাছা ও জীবাণু ধ্বংস হয়, অন্যদিকে পোড়া ছাই জমিতে প্রয়োগ করা হয়।
হ্যাঁ, রীতি ও আচার পালনের ব্যাপ্তি সংকুচিত হয়ে আসছে। নগরের উপাদানগুলো লম্বা হয়ে গ্রামে প্রবেশ করতে শুরু করেছে। বদলে যাচ্ছে জীবনযাত্রা, বিশেষ করে কৃষিব্যবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে গ্রামীণ জীবনযাপনে নানা হিসাব ঢুকে পড়েছে। তার পরও নগরমুখী না হয়ে বংশপরম্পরায় প্রত্যন্ত গ্রামে বসবাসকারী কৃষিনির্ভর মানুষের চৈত্রসংক্রান্তি ও পহেলা বৈশাখের রীতি ও আচার পালনের মধ্যেই জীবন্ত হয়ে আছে ঐতিহ্যগত সংস্কৃতি—বাংলা নববর্ষ।
আজকের যুগে বৈশাখ মাস বা খ্রিস্টীয় এপ্রিলের মধ্যভাগ শুধু বাংলাদেশে নয়; ভারতের আসাম, কেরালা, ওড়িশা, ত্রিপুরা, মণিপুর, পাঞ্জাব, পশ্চিমবঙ্গসহ শ্রীলঙ্কা, কম্বোডিয়া, লাওস, মায়ানমার, নেপাল, থাইল্যান্ড প্রভৃতি অঞ্চলের সব জনজাতির সাধারণ উৎসবে পরিণত হয়েছে এবং তা সম্পূর্ণ সেক্যুলার রূপ পরিগ্রহ করেছে। ফলে সময়ের পরিক্রমায় বৈশাখ উদযাপনের মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায় সমাজের বৈচিত্র্যের মধ্যে সমন্বয় সাধনের অসীম শক্তি। এই শক্তিকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিকশিত হতে দেওয়ার মধ্যেই রয়েছে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সম্প্রীতি ও শান্তির নিশ্চিয়তা।
যদি বৈশাখ উদযাপনের আবহমান রীতিসহ বাঙালি ও বাংলাদেশের সব জনজাতির উৎসব ও বহুমাত্রিক ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক উপাদানকে আমাদের আত্মপরিচয়ের প্রতীক হিসেবে গুরুত্ব দিতে হয়, তাহলে বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চলের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আয়োজনে ভরপুর পহেলা বৈশাখের পূর্ণাঙ্গ ছবিকেই আমলে নিতে হবে। বিশ্বায়নের এই যুগে জাতিগত পরিচয়, স্বাতন্ত্র্য সমুন্নত রাখতে হলে ঐতিহ্যসম্পৃক্ত থাকার বিকল্প নেই।
আজকে দেখা যাচ্ছে, কোনো না কোনো জুজুর ভয়ে ঐতিহ্যবাহী উৎসব-আয়োজনকে যেভাবে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করা হচ্ছে, তা অবশ্যই জাতিগত আত্মপরিচয় বিনির্মাণ ও সমুন্নত রাখার পথে বড় বাধা। সুসংহত সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে হলে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য পালনের অবাধ ও নিঃশঙ্ক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
